যে কারণে ডেট্রয়েটের বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের উপর মহামারীটির প্রভাব বোঝা জটিল

দ্বারা অনুবাদ বেঙলিস্ অফ নিউইয়র্ক

ছোটবেলায় আমি যখন হ্যামট্রাম্কে থাকতাম, কেউ পাশের বাড়িতে পানির ঝর্ণাটিও চালু করলে সেটা আমি শুনতে পেতাম। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে যখন আমাদের ঘরের জানালা খোলা থাকতো তখন তাদের কথোপকথন আমি প্রায় পুরোটাই শুনতে পেতাম । যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার মনে পড়ে যে ঘরের পর্দাগুলো সবসময় বন্ধ রাখতে হতো তা না হলে আমাদের প্রতিবেশীরা আমাদের ঘরের ভিতরে সব কিছু দেখতে পেত। 

এক কিংবা দুই তলা বাংলোতে, বা দুটো ফ্ল্যাটে অনেকগুলো মানুষ ঠেসে থাকতো, এক বাসা থেকে অপরের পাঁচ ফুটেরও কম দূরত্ব, যা কি না বাতাস চলাচলের একটি সরু রাস্তা পরিমাণ জায়গা। কিছু ক্ষেত্রে, খালা, চাচা, চাচাতো ভাই-বোন এবং দাদু-দাদীদের সমন্বয়ে দুটি বা তিনটি পরিবার একসাথে একই পরিবারে বাস করে। পরিবারের অনেক ছোট সদস্যরা পড়াশুনা, বাসার যাবতীয় কাজ করা এবং ভাইবোনদের উপর নজর রাখার পাশাপাশি তাদের বয়স্ক আত্মীয়দের দেখাশোনারও কাজ করে। যেমন খাবার রান্নাতে সহায়তা করা, গুরুত্বপূর্ণ ফর্ম পূরণ করা, ইংরেজী থেকে বাংলায় বার্তাগুলো অনুবাদ করা এসবই সাধারণ কাজ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশী রীতি অনুসারে প্রবীণ প্রজন্ম যেন অযৌক্তিক বোঝা ছাড়া ও ঝামেলাহীন জীবনযাপন করতে পারে তা নিশ্চিত করা পরিবারের তরুণ সদস্যদের দায়িত্ব। আমার বিয়ের প্রথম কয়েক বছরে আমি নিজেও এই ভূমিকা নিতে শুরু করেছিলাম।

আমি যখন বিয়ের পর ওয়ারেনে থাকা শুরু করলাম, তখন আমি নির্দ্বিধায় বাসার পর্দা সরাতে পারি প্রতিবেশীর নজর পড়ছে কিনা ঘরের ভেতর এই ভয় ছাড়া। আমাদের প্রতিবেশী ও আমাদের বাড়ির মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণের দূরত্ব আছে। এবং তারা নিজেদের মধ্যেই থাকেন। খুব বেশি হলে বাসার ড্রাইভওয়েতে দেখা হলে ভালো-মন্দ কথাবার্তা হয়।

কোভিডের এই সময়ে হ্যামট্রাম্কের মানুষের কথা মনে করে ভাবতেই ভয় লাগে, যখন দেখি যে তারা তুলনামূলকভাবে বিশাল সংখ্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই মহামারীতে। কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার কারণে আমেরিকা জুড়ে শহরগুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ এবং খয়েরি বর্ণের বাসিন্দারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা অনেক বেশি উদ্বেগজনক হারে মারা গিয়েছে, এবং তাও অনেক মারাত্মক পরিস্থিতিতে। যথাযথ সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখতে পারায় – তা হয়তো আর্থিক দুরবস্থা বা সাংস্কৃতিক কিছুর রীতির কারণে – ইংরেজী ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো না থাকাতে, এবং এই নির্দিষ্ট জাতিগত জনগোষ্ঠী ভাইরাস দ্বারা কীভাবে আক্রান্ত হয়েছে সে সম্পর্কে উপলব্ধ তথ্যের অভাব এটাই জানান দেয় যে এই সংকটকালীন সময়ে অভিবাসী সম্প্রদায়গুলো কত দুর্বলতার মুখোমুখি হয়েছে।

বিশেষ করে প্রবীণ বাংলাদেশী মহিলারা সংক্রমিত হওয়ার সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায়ই ভুল তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, যার মূল কারণ তাদের প্রাত্যহিক জীবনে তরুণ প্রজন্মের উপর এই তথ্য প্রদানের নির্ভরতা, যা কিনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাচাই করা ছাড়াই তাদের দেয়া হয়। কাউন্টি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২২,০০০ জনসংখ্যার হ্যামট্রামকে, ‘ওয়েইন’ কাউন্টির ছোট শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নিশ্চিত কোভিড -১৯ কেস রয়েছে – ১৮১৫টি কেস। এর চাইতে তিনগুণ বড় শহরগুলোকে পেছনে ফেলে ‘ওয়েইন’ কাউন্টির মধ্যে হ্যামট্রাম্ক ১০ নম্বরে। যদিও ‘ডিয়ারব্রণ’ এবং ‘ডিয়ারব্রণ হাইটস’ এর মতো বড় শহরগুলোতেও অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি এবং হ্যামট্রাম্কের তুলনায় কোভিডের হার বেশি, কিন্তু হ্যামট্রাম্কের ঘনবসতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে বিশেষভাবে দুশ্চিন্তাজনক। হ্যামট্রাম্ক মিশিগানের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, যার কারণে একা একা আলাদা করে রাখার মতো সামাজিক দূরত্বের ব্যবস্থাও কঠিন। ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ট্রান্সলেশনাল সায়েন্স অ্যান্ড ক্লিনিকাল রিসার্চ ইনোভেশন এর ফিনিক্স প্রজেক্টের ভৌগলিক তথ্য সিস্টেমের পরিচালক, অ্যালেক্স বি হিল বলেছেন, ২০২০ সালে মেট্রো ডেট্রয়েটে হ্যামট্রাম্কে বারবার একটি বড় হটস্পট হিসাবে দেখা গেছে, যেখানে কোভিড -১৯ প্রবলভাবে ছড়ায়। নভেম্বরের শুরুতে কেবলমাত্র এক সপ্তাহে কেসের হার ১৩ থেকে ২৭ শতাংশে বেড়ে যায়।

হিল ফিনিক্স প্রজেক্টে কাজ করছেন যেখানে তাকে অঞ্চলভিত্তিক প্রতি সপ্তাহে কোভিড -১৯ এর রিপোর্ট করা কেসগুলোর অনুসরণ করতে হয় এবং এর থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে যাচাই করতে হয় মোবাইল টেস্টিং সাইটগুলোর বহর কোথায় পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, “কিছু সপ্তাহ এমন ছিলো যেখানে আমরা বারবার ভাবছিলাম যে আমাদের এখনই হ্যামট্রাম্কে পৌঁছানো উচিত।”

নভেম্বর ৩ এর নির্বাচনের কিছুদিন পর একজন সিটি ক্লার্ক এবং অন্তত দুইজন কর্মীকে ভাইরাসটির জন্য পজিটিভ পাওয়ার পরপরই হ্যামট্রাম্ক সিটি ক্লার্ক অফিস অস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকে। আগষ্ট মাসে মেয়র কারেন মাজেস্কিকেও পজিটিভ পাওয়া যায়। মিশিগান করোনাভাইরাস টাস্ক ফোর্স অন রেশিয়াল ডিসপারিটিস্ এর ডিসেম্বর মাসের প্রকাশিত একটি ইনটেরিম প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ১ থেকে অক্টোবর ৩১, ২০২০ সময়কালে প্রায় ১০,৭০০ এশিয়ান আমেরিকান প্যাসিফিক আইল্যান্ডারের “সম্ভাব্য বাড়তে থাকা, নিশ্চিত কোভিড-১৯ কেস পাওয়া যায় এবং মিশিগানে তাদের মৃত্যু হয় প্রতি মিলিয়নে।” এই টাস্ক ফোর্সটি তৈরি করা হয় গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের অফিস থেকে স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর সময় এইসব দুরবস্থা অনুকরণ করতে ও প্রতিবেদন বানাতে।

পরিসংখ্যান যা দেখায় না তা হলো এই যে, অনেকগুলো জনগোষ্ঠী এই রেশিয়াল ক্যাটাগরিতে পড়ে, যার ফলে ঠিক কোন জনগোষ্ঠী বা জাতীয়তার মানুষজন এই ভাইরাসটির দ্বারা প্রভাবিত তা অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে যেখানে হ্যামট্রাম্কের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হলো আরবীয় বংশগত, এই তথ্যটি সেনসাস ডাটায় অন্তর্ভুক্ত নয়। হ্যামট্রাম্কের জনসংখ্যার অন্তত ৮০ শতাংশই হলো কৃষ্ণাঙ্গ বা খয়েরি বর্ণের বাসিন্দা। এই শহরের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ বাংলাদেশী যা কিনা আমেরিকায় বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে তৃতীয় বৃহতম। ধারণা করা হয় হ্যামট্রাম্কে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ইংরেজী ছাড়া আরও একটি ভাষায় কথা বলে। মানুষ আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে আরো সমৃদ্ধ শহরের খোঁজে এই এলাকা ছাড়ার ফলে এর জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।

জার্নালিস্টস্ ইন এজিং ফেলোস্ প্রোগ্রাম এর অংশ হিসেবে এবং টোস্টাডা ম্যাগাজিন  এর সাথে আমি তিন পর্বের ধারাবাহিক একটি প্রতিবেদন লিখবো বাংলাদেশী প্রবীণদের ওপরে, বিশেষ করে নারীদের ওপর এবং কীভাবে স্থানীয় জননেতারা কোভিড-১৯ মহামারীর এই সময়ে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভুল তথ্য পৌঁছানো ঠেকাবে।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হবে যেখানে আমি কথা বলবো কীভাবে আমাদের বাংলাদেশী সম্প্রদায় এই মহামারীতে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আমি এটাও আলোচনা করবো এই সংকটে ভাষার প্রভাব এবং বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসা এই দুরবস্থার প্রতিকারগুলো সর্ম্পকে।

(credits)

বেঙলিস্ অফ নিউইয়র্ক (বিওএনওয়াই) এমন একটি মাধ্যম যারা বাঙালি সংস্কৃতি ও মানুষদের উদযাপন করে গল্প বলা, কমিউনিটি গড়া এবং এসবের আলোচনার মধ্য দিয়ে যেন এই অভিবাসী সম্প্রদায়টি আরো সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো বাঙালি (যেসব মানুষ বাংলাদেশ, ভারতের কিছু অংশ এবং পাকিস্তান থেকে আসেন) অভিবাসীদের প্রভাবিত করার এবং তাদের কাছে পৌঁছানোর, তবে মূলত নিউইয়র্কে, যেখানে আমাদের এই টিমের বেশিরভাগ সদস্যের বসবাস। 

এই সম্পাদকীয় প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে দ্যা জেরন্টোলজিকাল সোসাইটি অফ আমেরিকা, দ্যা জার্নালিস্টস্ নেটওয়ার্ক ওন জেনারেশনস্ আ্যন্ড দ্যা  সিলভার সেন্চুরি ফাউনডেশন এর একটি জার্নালিসম ফেলোশিপের সাহায্যে।

Nargis Hakim Rahman

Author: Nargis Hakim Rahman

Nargis Hakim Rahman is a Bangladeshi American Muslim freelancer journalist and a mother of three. Nargis graduated from Wayne State University with a Bachelor’s degree in journalism, and a psychology minor. She is passionate about community journalism in the Greater Detroit area. She hopes to give American Muslims and minorities a voice in the press. She took part in a food journalism fellowship with Feet in 2 Worlds/WDET 101.9 FM radio. She writes for Haute Hijab, Brown Girl Magazine, Metro Detroit Mommy and other publications.

No Comments Yet

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: